তাসাউফের বৈঠক · ইবনে আদম

বই পরিচিতি

সুফি, তাসাউফ ও তরিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের ধাঁধা দূর করতে রচিত। অন্ধ সমর্থন বা অন্ধ বিরোধিতা নয়—কুরআন-সুন্নাহর মিজানে বাস্তবতা পাঠকের সামনে তুলে ধরাই এ বইয়ের লক্ষ্য।

‘সুফি’, ‘তাসাউফ’ ও ‘তরিকা’ শব্দগুলো বাংলাদেশের মানুষের কাছে অপরিচিত নয়। ওয়াজে, বইয়ে, মাজারে, খানকায়, পারস্পরিক আলোচনায় কিংবা ধর্মীয় বিতর্কে শব্দগুলো বারবার শোনা যায়। কিন্তু শব্দ যতই পরিচিত হোক, ধারণা পরিষ্কার নয়। বরং দীর্ঘদিনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, ভক্তির তাড়না, কঠোর বিরোধিতা এবং বাস্তব কিছু বিকৃতির কারণে শব্দগুলো এখনো অধিকাংশের মাথায় ধাঁধার মতো হয়ে আছে।

সুফি কে? তাসাউফ কি ইসলামেরই একটি শাস্ত্র, নাকি বাইরে থেকে যুক্ত হওয়া কোনো মতবাদ? তরিকা কি আত্মশুদ্ধির সুশৃঙ্খল পথ, নাকি কোনো পীর ও বংশের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য? শরিয়ত ও তরিকত কি দুটি পৃথক পথ? হাকিকত আর মারিফতের অংশটাই বা কোথায়? মুর্শিদের প্রয়োজন কেন? বায়াতের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? তাসাউফের নামে প্রচলিত সবকিছুই কি গ্রহণযোগ্য? কিছু ভণ্ড ও পথভ্রষ্ট দাবিদারের কারণে তাসাউফের পুরো ঐতিহ্যকেই কি বাতিল করে দেওয়া যাবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর সাধারণত দুই প্রান্ত থেকে আসে। একদল এমনভাবে তাসাউফের প্রশংসা করেন, যেন এ নামের সঙ্গে যুক্ত কোনোকিছুই ভুল হতে পারে না। অন্যদল এমনভাবে বিরোধিতা করেন, যেন ইতিহাসের সব সুফি, তরিকা ও আত্মশুদ্ধির সাধনা পুরোটাই ভ্রান্তি। মাঝখানে থাকা সাধারণ মানুষ কখনো মুগ্ধ হন, কখনো ভীত হন; কিন্তু ধাঁধা থেকে বের হতে পারেন না।

এই বই লেখার প্রধান উদ্দেশ্য সেই ধাঁধা দূর করা। কোনো পক্ষের অন্ধ সমর্থন কিংবা অন্ধ বিরোধিতা নয়; নামের আগে বাস্তবতা এবং দাবির আগে তার বাস্তবতা পাঠকের সামনে তুলে ধরাই এ বইয়ের লক্ষ্য। বইটি শেষ করার পর পাঠক যেন পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারেন—তাসাউফ কী, কেন এর প্রয়োজন হয়েছে, এর শেকড় কোথায়, কুরআন-সুন্নাহ কিংবা শরিয়তের সঙ্গে এর সম্পর্ক কেমন, সুফি, তাসাউফ কিংবা তরিকত বলতে মূলত কী বোঝানো হয়, কোন সীমা অতিক্রম করলে তা আর গ্রহণযোগ্য তাসাউফ থাকে না।

এ যাত্রাটি শুরু হয়েছে অন্তরের সংকট থেকে। মানুষ নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, হালাল-হারাম শেখে; তবু তার ভেতরে অহংকার, হিংসা, লোভ, রিয়া, আত্মপ্রশংসা ও মানুষের স্বীকৃতির ক্ষুধা থেকে যায়। সে সত্য কথা বলতে পারে অন্যকে পরাজিত করার জন্য, দান করতে পারে প্রশংসা পাওয়ার জন্য, ইলম অর্জন করতে পারে মানুষকে ছোট দেখানোর জন্য। বাহ্যিক কাজটি ঠিক হলেও তার ভেতরের উদ্দেশ্য অসুস্থ হতে পারে।

ইসলামের যে শিক্ষা মানুষের আমলের সঙ্গে তার নিয়ত, অন্তর, চরিত্র ও নফসের সংশোধনকে যুক্ত করে, তাসাউফের মূল আলোচনা সেই জায়গায়। এটি শরিয়তের বিকল্প কোনো পথ নয়; বরং শরিয়তের অনুসরণকে মানুষের অন্তর ও চরিত্রে জীবন্ত করে তোলার সাধনা। তাসাউফ মানুষকে সংসার, উপার্জন ও সামাজিক দায়িত্ব থেকে পালাতে শেখায় না; বরং ইবাদত, পরিবার, বাজার, বন্ধুত্ব, বিরোধ, ক্ষমতা ও সম্পদের ভেতরে সে আল্লাহর বান্দা হয়ে থাকতে পারছে কি না—সেই পরীক্ষা নেয়।

এ বইয়ে তাই শুধু সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তাসাউফের নববী ভিত্তি, ইহসানের সঙ্গে তার সম্পর্ক, শব্দটির উৎপত্তি, স্বরূপ, ঐতিহাসিক বিকাশ, সোহবত থেকে সিলসিলা ও তরিকার গঠন, শরিয়ত-তরিকত-হাকিকত-মারিফতের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং মুর্শিদ-মুরিদের সম্পর্কের প্রয়োজন ও সীমা ধারাবাহিকভাবে আলোচিত হয়েছে।

এই বইয়ের আরেকটি দিক হচ্ছে, তাসাউফের নামে জন্ম নেওয়া বিকৃতিগুলোকেও আড়াল করা হয়নি। ব্যক্তিপূজা, শরিয়তের ঊর্ধ্বে ওঠার দাবি, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাকে চূড়ান্ত দলিল বানানো, বংশ ও পোশাককে সত্যতার প্রমাণ ধরা এবং মানুষের মুক্তির দায়িত্ব কোনো ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া—এসবের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য তাসাউফের পার্থক্য কিংবা সীমা স্পষ্ট করা হয়েছে।

আলোচনাটি শুষ্ক পাঠ্যবইয়ের ভাষায় এগোয়নি। একটি দিঘি, বটতলার বৈঠকখানা, কয়েকজন প্রশ্নাকুল তরুণ এবং গল্পের কেন্দ্রে থাকা এক মুসাফিরের আলাপের মধ্য দিয়ে বিষয়গুলো ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে। কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর শুধু শুনলেই বোঝা যায় না; প্রশ্নটির সঙ্গে মানুষকে কিছু দূর হাঁটতে হয়। শেষ পর্যন্ত সব দাবি একটি মিজানের সামনে দাঁড়াবে। সে মিজানের প্রথম ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহ। এর সঙ্গে দেখা হবে শিক্ষা, আমল ও ফলের সামঞ্জস্য; বিশুদ্ধ আকিদা, শরিয়তের অনুসরণ, বিনয়, দায়িত্ববোধ, মানুষের হক এবং চরিত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন।

এই আলোচনার ভিত্তি অবশ্য তাসাউফের সর্বজনস্বীকৃত ঐতিহাসিক পাঁচটি কিতাব। ইমাম আবুল কাসিম কুশাইরি (রহ.)-এর আর রিসালাতুল কুশাইরিয়্যাহ, দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.)-এঁর কাশফুল মাহজুব, শিহাব উদ্দিন ওমর সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এঁর আওয়ারিফুল মায়ারিফ, মুহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি (রহ.)-এঁর ফুতুহাতে মাক্কিয়্যাহ, আবদুল কাদির ইসা (রহ.)-এঁর হাকায়িক আনিত তাসাউফ। আলোচ্য বিষয়গুলোর সহজ-সরল ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি অন্তর্গত সাদৃশ্য এবং পার্থক্য দেখানো হয়েছে প্রধান পাঁচ লেখকের ভাষ্যে।

তবে মূল আলোচনা এই পাঁচ কিতাবের ভিত্তিতে এগিয়ে গেলেও প্রাসঙ্গিকতার বিচারে এসেছে আরও বহু লেখক এবং বইয়ের আলোচনা। সেই সঙ্গে তাসাউফ যাদের হাত ধরে একাডেমিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, যেমন: হাসান বসরি, সুফিয়ান সাওরি, জুনাইদ বাগদাদি, বায়েজিদ বোস্তামি, ইবরাহিম বিন আদহাম, মালেক বিন দিনার, রাবেয়া বসরি, ফুজাইল ইবনে ইয়াজ, আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক, জুননুন মিশরি, মারুফ কারখি, সাররি সাকতি-সহ আরও অনেক মনীষীর আলোচনা তো অবধারিতভাবে আছেই। তাই এই বইয়ের পাঠ গল্পাকারে আগালেও একে কোনোভাবে কল্পকাহিনি ভাবার বিন্দুমাত্র সুযোগ নাই।

ওজন করার আগে পাল্লা খালি করতে হয়। তাসাউফকে বুঝতেও অন্ধ ভালোবাসা ও অন্ধ বিরাগ—দুই ভারই আগে নামাতে হবে। এই বই সেই খালি পাল্লায় রেখে সুফি, তাসাউফ ও তরিকার বাস্তবতাকে দেখার চেষ্টা। যাতে দীর্ঘদিনের ধাঁধা কেটে যায়, দ্বিধার জায়গায় স্পষ্টতা আসে এবং পাঠক নিজেই আসল পথ ও তার নামে তৈরি বিকৃতির মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন।

বাংলা ভাষাভাষী সর্বস্তরের পাঠকের সামনে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা উপস্থাপন করতে পারায় সর্বপ্রথম মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। সেই সঙ্গে অগণিত দরুদ ও সালাম পবিত্র ধারার পরম পরাকাষ্ঠা নিয়ে আগমনকারী প্রাণপ্রতিম রসুলের পবিত্র কদমে। শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি—তাসাউফের মহান ইমামগণ থেকে শুরু করে সমস্ত সুফিদের। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি যারা যারা এই বইকে এই পর্যন্ত নিয়ে আসতে সহযোগিতা করেছেন, সবার প্রতি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই প্রচেষ্টা কবুল করুন। আমিন!

কানজুল হিকমাহ প্রকাশনী · ৫০% পর্যন্ত ছাড়ে প্রি-অর্ডার

যা যা থাকছে...

  1. অন্তরের সংকট
  2. তাসাউফ: আত্মার ব্যাকরণ
  3. নববী উত্তরাধিকার
  4. সফ, সাফা, সুফ, সুফফা: শেকড়ের সন্ধানে
  5. নতুন ফলকের পুরোনো বাস্তবতা: ইহসান
  6. সোহবত থেকে সিলসিলা: ঐতিহাসিক বিকাশ
  7. শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারিফত: পূর্ণাঙ্গ অবয়ব
  8. পথের দিশা
  9. সোহবত, মুর্শিদ ও সিরাতাল মুস্তাকিম
  10. ১০অন্তর থেকে সমাজে
  11. ১১বিকৃতির বাজার: নুসখা থেকে ফটোকর্ড
  12. ১২গ্রহণযোগ্য তাসাউফের চূড়ান্ত মিজান
  13. ১৩বিদায় বেলায়...